রিফাত হাসানের সঙ্গে আড্ডা (প্রথম ভাগ)
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখ, শুক্রবার ‘আমরা তিনজন শুনি’র আয়োজিত আড্ডায় ছিলেন কবি, লেখক এবং বুদ্ধিজীবী রিফাত হাসান। আড্ডাটি অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘর প্রাঙ্গণে। সম্পূর্ণ আড্ডার ভিডিও আমাদের ফেসবুক পেইজে আপলোড করা আছে। আড্ডাটির টেক্সট ভার্শন তিনভাগে আমরা এ ব্লগসাইটে প্রকাশ করবো। আজকে থাকছে প্রথম ভাগ।
মিরাজ মিঠু: ধন্যবাদ সবাইকে। আমি একটু নিজের কথা বলি—আমার হচ্ছে ফর্মালভাবে কথা বলতে একটু সমস্যা হয়। তো এমনিতে ভাইঙ্গা ভাইঙ্গাই বলি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যে এখানে একটা অনুষ্ঠান করতেছি, সত্যিকার অর্থে পাবলিক স্পিয়ারে কথা বলা বা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মতো ওইভাবে পরিবেশ নাই বলতে গেলে। তাই আমরা ওইভাবে বাইরে পাবলিকলি এই অনুষ্ঠানের প্রচার করি নাই; রিফাত ভাইয়েরও পাবলিক প্রোগ্রামে অস্বস্তি আছে, তাই আপনারা যারা ব্যক্তিগত পরিচিত এদেরকেই বলছি, যাতে ঘরোয়া আড্ডার পরিবেশ অক্ষুণ্ণ থাকে।
বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বা লেখালেখি তো অনেকেই করেন। কিন্তু আমরা ক্যান রিফাত হাসানকে এখানে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি বা আজকে তারে কেন আনছি? প্রথমে এই বিষয়টা একটু ক্লিয়ার করা দরকার। এক নাম্বারে, আমরা যারা আয়োজক, এরা মনে করি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যারা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করছে, এদের মধ্যে রিফাত হাসান অন্যতম। শাপলা এবং শাহবাগ যে আন্দোলন হইছে আমাদের এখানে, এই জায়গাগুলাতেও রিফাত হাসানের একটা পরিষ্কার অবস্থান আছে। এছাড়া বর্তমান সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে বয়ান বা তার প্রভাব, এটা নিয়া রিফাত হাসানের একটা ক্রিটিকাল অবস্থান আছে। সেই অবস্থানটা আমাদের দীর্ঘদিনের জাতীয়তাবাদের যে বয়ান বা চিন্তা, সেটাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। আবার আমরা যারে মুক্তিযুদ্ধ বইলা আসতেছি, তিনি বলতেছেন এটা নিজেদের জন বা গণযুদ্ধ; একইসাথে উনি বলতেছেন যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় নেতাদের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে বিপ্লব হাতছাড়া হইছে এবং একটা প্রতিবিপ্লবী জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হইছে। সবশেষে, তিনি নিজে মাঝেমধ্যে মজা করে বলেন, এই সময়ের সবচেয়ে গণতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবীদের একজন রিফাত হাসান। উনি মজা করে বললেও উনার এ বক্তব্য আমরা এন্ডোর্স করি। আমরা চাই আজকের আড্ডায়ও আপনারা সবাই গণতান্ত্রিক থাকবেন, মানে সবার সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটা স্বতঃস্ফূর্ত আড্ডা হয়ে উঠবে বলে আশা করি। আপাতত এটুকু।
সৌরভ মাহমুদ: আমরা তাহলে শুরু করতে পারি। মুকিম…
আবদুল মুকিম: আচ্ছা, আপনার যে বইটা প্রকাশ হয়েছে দুই হাজার চৌদ্দ সালে, ‘সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি’, এরপরে তো দশ বছরের লম্বা একটা টাইমফ্রেম, এ সময়ের মধ্যে আমাদের দেশের রাজনীতি বলেন বা বিশ্বরাজনীতি বলেন, একটা মোটামুটি পরিবর্তন তো এসেছে। তো দশ বছর আগে লেখা বইয়ের কন্টেন্টগুলোর সাথে কি রিফাত হাসান এখনও একমত কিনা বা ওই চিন্তাগুলো থেকে সরে আসার কোনো সিচুয়েশন তৈরি হয়েছে কিনা? কিংবা রিভিজিট বা রিথট দেওয়ার একটা জায়গা তৈরি হয়েছে কিনা?
রিফাত হাসান: রিভিজিট দেওয়ার ব্যাপারটা সবসময়ই থাকে। কিন্তু ধরেন, পরিবর্তন যেটা বুঝায়, সেরকম কোনো ঘটনা ঘটে নাই। মানুষের চিন্তা ব্যাপারটা হচ্ছে একটা জার্নি। সে-জায়গা থেকে মোটামুটি আপনি ধরে নিতে পারেন, দশ বছর আগে যেখানে ছিলো, ওখান থেকে আমি আরও অনেক সামনে এসেছি। কিন্তু ধরেন, এটা যদি কোনো স্পেসিফিক ইস্যুতে বলেন, তাহলে আমি বলতে পারবো যে, এ বিষয়ে আমার অবস্থান আগে এরকম ছিলো, এখন এটাতে কোনোভাবে আমার রিভিজিট করা দরকার কিনা। ওভারঅল আমার মনে হয় যে, আমরা যে বিন্দুতে ছিলাম, সে-বিন্দু থেকে আমাদের জার্নি হইছে, কিন্তু কোনোরকম পরিবর্তন হয় নাই। মানে, এইটারে আপনি কোনোভাবে ইয়ে করতে পারবেন না, ধরেন, দুই হাজার চোদ্দ সালে বা তের সালে যখন আমরা শাহবাগের ব্যাপারে কথা বলতেছিলাম, (আমার কথা শোনা যাচ্ছে তো?), এখন এসে সে-ব্যাপারে আমাদের কোনো কথা দিক পরিবর্তন করে নাই। কিন্তু, পলিটিক্স ব্যাপারটাই এমন, এইটার পদ্ধতিগত আলাপ করা যাবে সবসময়। রিভিউ করা যাবে। আপনি রিভিজিট করে বলতে পারবেন, দুই হাজার চোদ্দ সালে বা তের সালে আমরা যেসব অবস্থান নিয়েছিলাম, এটা পলিটিক্যালি ভুল কিনা। মানে পলিটিক্যালি ভায়োবেল কিনা, সেটা বলতে পারবেন। যেমন, এমন হইতে পারে যে, দুই হাজার তের সালে যখন হেফাজত ঢাকায় শাহবাগের বিপরীতে ক্ষমতা হিসেবে সামনে হাজির হইলো, এ ঘটনাটাকে আমরা প্রত্যেকে যেভাবে রেসপন্স করেছি, এই রেসপন্সের অনেক রকম ফলাফল হতে পারতো। মাঝখানে আমরা এ ধরনের একটা আলাপ করছিলাম, ধরেন, পাঁচ-ই মে-র ঘটনাটা যেভাবে একটা যৌথবাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে শেষ হয়েছিলো, অভিযানের মাধ্যমে শেষ না হয়ে যদি হেফাজতের রেসিসটেন্সের বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হইত, তাহলে বাংলাদেশটা কেমন হইত—এরকম একটা ভাবনা আমরা ভাবতাম। দেখা গেলো যে, বাংলাদেশটা সে-সময় কেমন হইত, সেটা নিয়ে আমাদের বুদ্ধিজীবীদেরও কোনো আলাপ ছিলো না। পলিটিশিয়ানদেরও কোনো প্ল্যান ছিলো না। তার মানে হচ্ছে যে, উনারা সবাই একটা অদৃষ্টের উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন পুরো ঘটনাটা। এই ছেড়ে দেওয়াটাকে আমরা ক্রিটিক করি। আমি বলি যে, ধরেন, সে-সময়ে আমাদের এখানকার যারা বড় বড় বুদ্ধিজীবী ছিলেন, তারা অনেকগুলো জিনিস ধরতে পারছিলেন, আমাদের এখানকার আমাদের মানুষের নাড়িটা ধরতে পারছিলেন, মানুষ কী চাচ্ছে সেটা ধরতে পারছিলেন। আবার শাহবাগের যেটা মূল অসুখ, সেটাও তারা ধরতে পারছিলেন। কিন্তু তাদের গন্তব্যটা ধরতে পারেন নাই কেউ। মানে আমাদের নিজেদের গন্তব্য কী হবে, সেটা ধরতে পারেন নাই। যেটার কারণে পাঁচ-ই মে এক ধরনের যেটা গণহত্যা হইছিলো, যেই শব্দের ব্যাপারে শাসকগোষ্ঠীর আপত্তি আছে বা তাদের পছন্দের লোকেদের আপত্তি আছে, মানে প্রচুর মানুষ মারা গেছিলো, যাদের ব্যাপারে এখনও পর্যন্ত কোনোরকম, আপনার, পরিসংখ্যান পর্যন্ত নাই৷ পরিসংখ্যান নেই, এমনকি মানুষ ভয়ে কোনোভাবে বলে না। কোনোকিছু প্রকাশ করে না। ভুক্তভোগীরাও কিছু বলে না। কিন্তু এ ঘটনার পর দেখা গেছে কী, এ ঘটনাকে সামাল দেওয়ার মতো তাদের আসলে পলিটিক্যাল কোনো কর্মসূচি ছিলো না। আফটারঅল, হেফাজত জিনিসটা তখনও এবং এখনও পুরাপুরি একটা অরাজনৈতিক সংগঠন ছিলো। এবং একটা অরাজনৈতিক সংগঠনকে দিয়ে আপনি যখন একটা রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিকল্পনা করবেন, এটা আসলে খুবই অরাজনৈতিক একটা ঘটনা হিসেবে কনসিকুয়েন্স দাঁড়াবে আরকি, যেটা হেফাজতের ক্ষেত্রে হইছে। হেফাজতের ক্ষেত্রে পেছনে কারা পরিকল্পনা করেছেন, সেটার ব্যাপারে জাস্ট জনশ্রুতিগুলোই তো আমাদের একমাত্র টুল। যেখান থেকে আমরা ধরে নিতে পারি, পেছনে কারা কারা ছিলো, কারা কারা প্ল্যান করেছেন। এটুকু ধরতে পারি যে, এরা কেউই সিনসিয়ার ছিলো না। এরা শুধুমাত্র একটা জাগাতেই সিনসিয়ার ছিলো, সেটা হচ্ছে যে, শাহবাগ নামে একটা ঘটনা হইছে, এটাকে মোকাবেলা করতে হবে, ডিল করতে হবে। এটা ওয়াইজ ওয়েতে হয় নাই। ধরেন, বাংলাদেশে বিএনপির মতো, সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল আমরা যদি ধরি বিএনপিকে, তারাও সংখ্যালঘুর মত করে আচারণ করছে সেই সময়। একটা পলিটিক্যাল বয়ান হাজির করতে পারে নাই। একটা যুদ্ধাপরাধের বিচার হইল, বিচারের ব্যাপারে তাদের কোনোরকম ক্রিটিক্যাল বয়ান দাঁড় করাইতে পারে নাই। অবিকল আওয়ামীলীগের যা বয়ান, বিএনপিরও তা-ই বয়ান ছিলো। শুধুমাত্র বিএনপি চুপ ছিলো, এটুকুর বাইরে আর কোনোরকম নিজেদের বয়ান হাজির ছিলো না। তো, এ ঘটনাগুলো নিয়ে আমাদের যারা বুদ্ধিজীবী, তাদের একটা রিভিজিট করার ব্যাপার হয়তো-বা থাকতে পারে। আমি, এখনও পর্যন্ত মনে করি, সেসময়ে আমাদের যেটি অবস্থান ছিলো, সে-অবস্থানটা, আমি, বিন্দুমাত্র কোনোরকম, ধরেন, মনে হয় না যে, আমি কোনো একটা ভুল পথ পার হয়ে আসছি। যেমন ধরেন, আমার আশেপাশে অনেক বন্ধুকে আপনারা খেয়াল করবেন, এ মুহূর্তে বাংলাদেশে খুবই পপুলার, সরকারবিরোধী আন্দোলন করছেন, কথাবার্তা, বুদ্ধিজীবিতা করছেন, তারপর সোস্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়ান্সার, তারা সবাই কিন্তু তাদের পথটাকে পরিবর্তন করছেন। পথটাকে পরিবর্তন করছেন বলতে, তাদের শাহবাগের সময় এক ধরনের অবস্থান ছিলো, তারপর দেখা যাবে যে, পাঁচ-ই মে তাদের অবস্থানটাকে চেঞ্জ করতে বাধ্য হয়েছেন, একারণে যে, পাঁচ-ই মে একটা গণহত্যা হয়েছিলো, এটা তাদের মানবিক অনুভূতিকে নাড়া দিছে। তারপর আবার, আরও পরে এসে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছেন, এরকম অনেকগুলো মানুষকে আপনি পাবেন। কিন্তু এ ঘটনাগুলোকে আমি এক ধরনের করে বোঝাপড়ার এবং পলিটিক্যাল ইম্যাচিউরিটি হিসেবেও দেখি। কারণ হচ্ছে যে, ধরেন, আমাদের এক বন্ধু আছে, একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ান, নৃবিজ্ঞান, তার একটা লেখার শিরোনাম ছিলো হচ্ছে “শাহবাগ কি একটা বিপ্লব?” মানে বাংলাদেশের মানুষ মানে একটা জনসমাগমকে বিপ্লব আকারে পাঠ করার তাগিদ ফিল করতেছিলো। এটা একটা অবাক কাণ্ড। মানে জনসমাগম এবং বিপ্লব যে এক না, এবং একটা মব দিয়েও তো জনসমাগম হইতে পারে। তারপর হচ্ছে যে আপনার, শাহবাগ জিনিসটি হচ্ছে যে, এমন একটা ঘটনা, যেটার সাথে একমাত্র জামাতে ইসলামী ছাড়া, যারা হচ্ছে যে এ বিচারের ভুক্তভোগী, তারা ছাড়া আর কারো প্রায় কোনো ধরণের দ্বিমত ছিলো না। মানে এ আন্দোলনের ব্যাপারে এক ধরণের সবাই একমত একমত একটা পরিস্থিতি তৈরি করছিলো। সরকারও হচ্ছে গিয়ে পুলিশ দিয়ে তাদের প্রটেক্ট করতেছিলো। এখানে বিপ্লব কোন জায়গা থেকে আসল? মানে এমন একটা সমন্বিত অবস্থা, সরকারেরও প্ল্যান এখানে আছে, সবার সহমত সহমত অবস্থা আছে এর ভেতরে। আবার তাদের উদ্দেশ্যটাও হচ্ছে শুধু ফাঁসি! বিদ্যমান কোনো ব্যবস্থার ব্যাপারে তাদের কোনো ক্রিটিক আছে, এটার কোনো মূলোৎপাটন চাচ্ছেন, এমন কোনো ঘটনা না। তো এ ধরণের ব্যাপারগুলো আমাদের ভেতরে দেখা গেছে আরকি। আমি এমনও লক্ষ্য করেছি, যেমন ধরেন, শাহবাগ প্রথম যেদিন হইল, এর আরও অনেকদিন পর, মনে হয়, দশ-বার তারিখের দিকে, পাঁচ তারিখের দিকে মনে হয় শুরু হইছিলো এই ঘটনা, তো আমরা যখন, শাহবাগের আজান নামে আমার একটা লেখা আছে, এটা নিয়ে একটু আগে কথা হচ্ছিলো, শাহবাগের আজান ও অন্যান্য লেখাগুলো আমি যখন লিখতেছিলাম, সেসময় পর্যন্ত আমি দেখেছি, আমরা সেসময়ে যাদের কথাবার্তার দিকে গুরুত্ব নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম, যে, এই লোক কিছু একটা বলুক, যেমন, ফরহাদ মজহার, তো ফরহাদ মজহার তখনও কিছু বলেন নাই। ফরহাদ মজহার তখন কলকাতার কোনো একটা প্রোগ্রামে ছিলেন। আমি খেয়াল করেছি, সেসময় পর্যন্ত চিন্তা গোষ্ঠীরও কেউ কেউ শাহবাগে গিয়ে হাজিরা দিয়ে আসছেন। শাহবাগে যেয়ে হাজিরা দিয়ে এসে, সে-সময়ে সবার একটা ট্রেন্ড ছিলো, ট্রেন্ডটা হচ্ছে যে, ধরেন, শাহবাগটা হচ্ছে এমন একটা জিনিস, আপনার প্রত্যেকটা সেক্টরে একটা খবরদারি কায়েম করছিলো। মানে আপনার ব্যক্তিগত কোনো ঘটনা ছিলো না। মানে আপনার ব্যক্তিগত কোনো অবস্থান থাকতে পারে না। আপনাকে আইদার এনিমি অর ফ্রেন্ড হতে হবে। আপনি ফ্রেন্ড কি এনিমি—এটা আপনাকে পরিষ্কার করতে হবে। ওরা এমন একটা অবস্থা তৈরি করে দিছিলো যে, চিন্তা পাঠচক্রের বলে পরিচিতরাও কেউ কেউ ওইখানে প্রতিদিন গিয়ে দেখায় দিয়ে আসছে, যে, না, আমরা হচ্ছে শাহবাগের বন্ধু। ছবি প্রকাশ করছে যে, এখানে, আমরা আজকে শাহবাগে গেলাম। শাহবাগের স্পিরিটের প্রতি নিজেদের সমর্থন ঘোষণা করছে। যারা হচ্ছে যে, শাহবাগের সবচেয়ে মূল প্রপাগাটারদের একজন, এরকম লোকও আছে। তো এই আরকি মোটামুটি ধরনের অবস্থান। (আপনারা যেটা করবেন, সেটা কি জানেন, মানে, আপনি আমাকে একটা প্রশ্ন করেছেন, প্রশ্নের প্রেক্ষিতে পাল্টা প্রশ্নও করে ফেলবেন।)
আবদুল মুকিম: আচ্ছা, হ্যাঁ, আমাদের এখানে একটু সম্পূরক প্রশ্ন আছে৷
রিফাত হাসান: হ্যাঁ, এটা করে ফেলিয়েন। নাইলে কিন্তু অনবরত কথাটা ইয়ে করা যাবে না।
আবদুল মুকিম: আমার মনে হয় আরকি, শাহবাগ নিয়ে আপনার অবস্থানটা পরিষ্কার। কিন্তু আমরা এখনকার সময়ে এসে যেটা দেখি, শাহবাগ পরবর্তীতে একটা শাহবাগের গ্রে এরিয়ার কথা বলা হচ্ছে। এ জিনিসটা কি আছে বা এক্সিট করে বলে আপনি মনে করেন?
রিফাত হাসান: হ্যাঁ, এ ধরণের একটা আলাপ আছে। আলাপটা হচ্ছে আসলে, মানে, আমি যেভাবে লোকেইট করি, শাহবাগের গ্রে এরিয়া ব্যাপারটা হচ্ছে যে, শাহবাগকে ডিজওন করতে চাওয়া। মানে এটা এমন না যে, শাহবাগের ভেতরে বিভিন্ন সেক্টর ছিলো, বা শাহবাগের ভেতরে মানুষের বিভিন্নরকম পজিশন ছিলো, একটা পজিশন ছিলো তারা হচ্ছে যে খুবই ধরেন একটা মানবতাবাদের জায়গা থেকে বা মোর লিবারাল জায়গা থেকে শাহবাগ করেছে, এরকম কোনো ঘটনা না। ঘটনা হচ্ছে যে, শাহবাগের যখন পতন হলো, এবং শাহবাগ যখন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পরাজিত হলো, আমি বলি যে, আমাদের কারণে পরাজিত হয়েছে, আমরা পরাজিত করেছি বলি, তো, এ পরাজয়ের কারণে তারা তখন শাহবাগকে ডিজওন করতে শুরু করলো। তো এ ডিজওন করার একটা তরিকা হচ্ছে যে, শাহবাগের তারা একটা গ্রে এরিয়াতে ছিলো। তারা আসলে ‘ফাঁসি চাই’ আন্দোলনে ছিলো না।
আবদুল মুকিম: তারা বিচার চেয়েছে?
রিফাত হাসান: হ্যাঁ, তারা বিচার চেয়েছে, ফাঁসি চায় নাই, এই ধরনের একটা সংশোধনমূলক অবস্থান প্রকাশ করতে চায়। আসলে ফাঁসির বাইরে কোনো শাহবাগ ছিলো না। এবং মূল ঘটনা হচ্ছে যে, শাহবাগ তো বাংলাদেশে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যেটা আছে, তাদের শাহবাগকে ওন এবং ডিজওন করার বাইরে আর কোনো পলিটিক্যাল অবস্থান ছিলো না। এবং তারা আসলে এখানেই ঘুরপাক খাইছে, এখনও পর্যন্ত তারা তাদের অবস্থানটাকেই শুধুমাত্র সংরক্ষিত করছে গ্রে এরিয়া শব্দটা দিয়ে৷ তারা বলতে পারতো যে, আমরা আসলে, যে কাজটা আসলে তারা জামাতের ব্যাপারে বলতো যে, জামাত তো উনিশশ একাত্তর সালে বিরোধিতা করেছিলো, কখনও ক্ষমা চায় নাই কেন? জামাতের ব্যাপারে এ অবস্থান যদি তাদের থাকে, তাদের ব্যাপারে এ অবস্থান আমাদের থাকবে, ভাই, তোমরা তো শাহবাগে ছিলা, ফাঁসির পক্ষে তোমরা অবস্থান নিয়েছিলা, এখন ফাঁসির ব্যাপারে তোমাদের অবস্থানটাকে রিরিড করছো না কেন? বলছো না কেন যে, এ অবস্থানটা আমাদের ভুল ছিলো? অথবা ভুল ছিলো না সুস্পষ্টভাবে বলে দাও। সহজ কথা। এটা হচ্ছে, সরাসরি পলিটিক্যাল অবস্থান। এটাই।
আবদুল মুকিম: আচ্ছা। আচ্ছা, আরেকটা ব্যাপার, আমরা কোনো ব্যক্তি নিয়ে প্রশ্ন করবো—এটা ভাবি নাই আরকি। তারপরেও আপনি যেহেতু ফরহাদ মজহারের বিষয়টা আনছেন, যে, উনার চিন্তা পাঠচক্রের কেউ কেউ গিয়ে ওখানে হাজিরা দিয়েছেন। কিন্তু উনি তো যেটা দাবি করেন আরকি, উনি বা উনারা, নুরুল কবিররা, কয়েকজন মিলেই শাহবাগ ঠেকায় দিছেন। তো এ ব্যাপারটাকে কীভাবে দেখেন?
রিফাত হাসান: (হাসি) মানে এই ব্যাপারটারে, শুনেন, মানে ফরহাদ ভাইরা যখন একটা পর্যায়ে এসে ফরহাদ ভাইয়ের চিন্তা পাঠচক্র তারা একটা প্রকাশ্য থিসিস দিছে যে, এই এই কারণে আমরা শাহবাগকে ডিজওন করি। সম্ভবত একুশ-বাইশ তারিখের দিকে। এর আগে তাদের কোন প্রকাশ্য স্টেইটমেন্ট ছিল না। এটা একটা ফ্যাক্ট, এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। তো এই ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের দিক থেকে যেটা আসছে, আর ফরহাদ ভাইদের থেকে যেটা আসছে, দুইটা আসলে পৃথকভাবে সবসময় বিবেচিত হবে এ কারণে যে, ইতিহাসে আমরা কে কীভাবে অবদান রাখতে পেরেছি সেটা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ না আসলে। মানে এটা আমাদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ না। আমরা কী করতে পেরেছি সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। কিন্তু আমরা যা করতে চেয়েছি, তা হইলো কিনা—সেটা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। ফরহাদ ভাইরা মিলে শাহবাগ ঠেকালো কিনা, বা আমরা মিলে শাহবাগ ঠেকাতে পারলাম কিনা, আমার কাছে এটার কোনো অর্থ নাই শেষ পর্যন্ত। কিন্তু এটা অর্থ আছে যে, ফরহাদ ভাইরা আমাদের সঙ্গে ছিলেন, একটা পর্যায়ে এসে। তো ফরহাদ ভাইরা আসার সুবিধা হইলো, ফরহাদ ভাইরা হচ্ছে যে, অলরেডি বহু বছর ধরে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সম্পর্কে কথাবার্তা অভিভাবকের মতো বলে আসতেছে। তারা অলরেডি তখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভিভাবকের মতো ভূমিকায়। একজন অভিভাবক কথা বলা, আর আমরা যখন কথা বলি, আমাদের সর্বোচ্চ প্রভাব ছিলো হচ্ছে, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী মহলে। ফরহাদ ভাইয়ের প্রভাব স্রেফ বুদ্ধিজীবী মহলে না, ফরহাদ ভাইয়ের প্রভাব হচ্ছে নানান কারণে মাসপিপলের কাছেও তাদের প্রভাব তৈরি ছিল। তো, এ কারণে তাদের অবস্থানটা আমাদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো কোনো কোনো সময়ে। কিন্তু আবার বুদ্ধিজীবী মহলের যেটা ঘটনা, সেটা, আমাদের ঘটনাটা, আমি মনে করি যে ফরহাদ ভাইদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। বাট, ইট ডাজন্ট ম্যাটার।
শ্রোতাবর্গের সারি হতে, তানভীর আলম রিফাত: সম্পূরক প্রশ্ন আমার একটু আছে। আমি একটু বলতে চাই যে, আমাদের দেশের সিনেমা-সিরিজ নিয়ে একটু কথাবার্তা হয়। যেমন সর্বশেষ যে সিনেমা নিয়ে এক দেড় বছর ধরে কথাবার্তা হচ্ছে, মহানগর নিয়ে। তো মহানগর মূলত হচ্ছে বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা যারা চালাচ্ছেন, তাদের মোটামুটি অসংলগ্নতা তুলে ধরেছে। তো এটা নিয়ে আমরা যখন কথা বলতাম, মানে, তখন একটা থট এরকম দাঁড়া হয়েছিলো যে, এ সিচুয়েশনটা এখানে আনার জন্য, ক্রিয়েট হওয়ার জন্য যে ভিতটা, সে-ভিতটা এ সিনেমার পরিচালক তৈরি করেছেন।
আবদুল মুকিম: আশফাক নিপুণ?
শ্রোতাবর্গের সারি হতে, তানভীর আলম রিফাত: হ্যাঁ। তো, এটার ক্ষেত্রে সলিউশানটা কী আসলে? তারা যদি বাংলাদেশের এ পরিস্থিতিটার জন্য দায়ী থাকেন…
রিফাত হাসান: মানে সিচুয়েশন কোনটা? আপনি আরেকটু ডিটেইল করেন। মানে তারা যে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী, সেটা কী কারণে?
সৌরভ মাহমুদ: আচ্ছা, আমি মনে হয় বুঝতে পেরেছি। কোয়েশ্চনটা ঠিক এরকম যে, বর্তমান বাংলাদেশ যে অবস্থায় আছে, কেমন অবস্থায় আছে সেটা তো আসলে বড় করে বলার কিছু নেই, তো ওই অবস্থায় যে আসছি আমরা, মানে যে কারণে, আশফাক নিপুণদের মতো পরিচালকরা শাহবাগে ছিলো…
আবদুল মুকিম: মানে উনারা শাহবাগে গিয়ে হাজিরা দিছেন?
রিফাত হাসান: আচ্ছা, শাহবাগে ছিলো এ ঘটনার কথা বলছেন!
সৌরভ মাহমুদ: হ্যাঁ, এটা একটা সম্পূরক প্রশ্ন। মানে এটার সলিউশন কী? মানে তারাই এটা দাঁড় করাইছেন, তারাই এটার বিরুদ্ধে সিনেমা বানাচ্ছেন।
শ্রোতাবর্গের সারি হতে, তানভীর আলম রিফাত: তো আমার কথা হচ্ছে, উনি এখন একটি যদি সিনেমা বানিয়ে ওইটার একটা কাফফারা আদায় করতে চান, বা ওইটার প্রায়শ্চিত্ত করতে চান, তাইলে সেক্ষেত্রে আমরা প্রায়শ্চিত্ত বলে মেনে নেবো কিনা।
সৌরভ মাহমুদ: এটা কি গ্রে এরিয়া হবে?
রিফাত হাসান: আশফাক নিপুণ কোথাও গ্রে এরিয়ার কথা দাবি করেছেন, আমার জানা নাই।
আবদুল মুকিম: আমিও দেখি নাই।
রিফাত হাসান: আমিও দেখি নাই৷ মানে সে কোনো গ্রে এরিয়ার কথা দাবি করেছে বলে জানা নেই৷ মানে হচ্ছে যে, যারা কাজ করে, তারা আসলে, তারা কখনও তাদের অতীতকে নিয়ে জাস্টিফিকেশানে যায় না। এটা গুরুত্বপূর্ণ না তার জন্য। যদি কোনো একটা পথ আপনি অতিক্রম করে আসলেন, অতিক্রম যেহেতু করে আসলেন, এটা যদি আপনার জার্নিও হয়ে থাকে, আপনি তো এ পথটা অতিক্রম করে এসে এই পথে এসেছেন। এখন, অতিক্রম করে আসার পরে, অতীতটাকে নিয়ে আপনি, হ্যাঁ… এটা হচ্ছে হীনমন্যদের ব্যাপার হচ্ছে, সে এটার জাস্টিফিকেশান তৈরি করার চেষ্টা করবে বা এটার কোনো ক্রিটিক করবে না। এরকম কোনো হীনমন্যতার ঘটনা দিয়েই কেবল আপনি ব্যাখ্যা করতে পারবেন না কোনো ইভেন্টকে। এবং এটাও, আপনি, বা যে কেউ যদি এটা বলে যে, আশফাকদের কারণে, ধরেন, বাংলাদেশ এ পর্যায়ে এসেছে, ঘটনাটা এরকম না, ঘটনাটা হচ্ছে যে, এরকম হাজার হাজার আশফাক ছিলো, বা আরও অনেকেই ছিলো। এবং তাদের বেশিরভাগ মানুষই রিরিড করে না নিজেদেরকে। যারা রিরিড করতে সক্ষম হইছে, তাদের ব্যাপারে এ আলোচনাটা অনর্থক আরকি। ধরেন, আশফাক যদি মনে করেন, তিনি রিরিড করতে সক্ষম হইছেন… হ্যাঁ, সে যদি বলতো, না, আমাদের একটা গ্রে এরিয়া আছে, তখন আপনি প্রশ্ন করতে পারতেন, তাহলে আপনাদের গ্রে এরিয়াটা ব্যাখ্যা করেন। সে এটুকুতেই তো যায় নাই৷ তারে এই প্রশ্ন আপনি করবেন কেমনে? বরং ঘটনা হচ্ছে যে, যারা এখনও পর্যন্ত মনে করেন, দুই হাজার তেরো সালে যেটা শাহবাগ ছিলো, এবং এটার ফলে যুদ্ধাপরাধ বিচারের যেটা কনসিকুয়েন্স দাঁড়াইছিলো, এ জিনিসগুলোর লেজিটিমেসির পক্ষে যারা এখনও কথা বলেন, তাদেরকে এ প্রশ্নগুলো করতে পারেন আরকি। আর আশফাক নিপুণের যেটা নাটক বা ওয়েবসিরিজ, আরও অনেকেই এ ধরনের কাজ করছেন। আমি রিসেন্টগুলো অনেকগুলো পাইছি, এ ভদ্রলোকের নাম কী, শিহাব শাহীনের যেটা নাটক আছে খুব বিখ্যাত, প্রচুর নাম করেছে। এ ঘটনাগুলো হচ্ছে যে, ধরেন, বাংলাদেশে যখন রাজনীতির অনুপস্থিতি তৈরি হইছে, এটা একটা ভ্যাকুয়াম তৈরি হইছে না? এ ভ্যাকুয়ামটাকে পূরণ করার জন্য এরকম আরও অনেকগুলো ওয়েবসিরিজ হবে। যে ওয়েবসিরিজগুলোর সাবজেক্ট দুর্নীতি হবে, কোনোভাবে পলিটিক্স হবে না৷ এখানে রাজনৈতিক আলাপ নিষেধ। এটা খেয়াল রাইখেন। এরকম অনেকগুলো জিনিস পাবেন, যেমন ধরেন, একটা স্টাডি এরকম আছে, ধরেন, কোনো একটা সোসাইটিতে যখন মন্দা তৈরি হয়, তখন লিপিস্টিক বিক্রি বেড়ে যায়। এটা হচ্ছে সেরকমই একটা ঘটনা। আমাদের এখানে রাজনীতিহীনতার কারণে, আপনি দেখবেন যে… আপনি এখানকার কথা বাদ দেন, আপনি দেখবেন যে, বিখ্যাত ইরানি সিনেমা, যেগুলো আমাদের এখানে মুভি অব দ্য উইকে দেখানো হইত, বিটিভিতে, এগুলো কেমন? মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ! ইরানে একটা সিনেমা হবে, সেটার সাবজেক্ট অবশ্যই মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হবে; এটার সাবজেক্ট কোনোভাবে পলিটিক্স হবে না। কারণ এখানে পলিটিক্স নাই। এ ধরণের রাজনীতিহীন সোসাইটিগুলোতে কীভাবে মানুষজন তাদের এন্টারটেনমেন্ট থেকে শুরু করে এ জিনিসগুলোকে যাপন করে, এগুলো একটু স্টাডি করলে বুঝবেন জিনিসটা। বাংলাদেশে এদের ঘটনাগুলো একই রকম। যেমন, শিহাব শাহীনের, যেটা আমি খেয়াল করলাম, এটাও মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
আবদুল মুকিম: অ্যালেন স্বপনে?
রিফাত হাসান: হ্যাঁ। মহানগরের ঘটনাও অলমোস্ট কাছাকাছি, একই ধরণের ঘটনাগুলা।
সৌরভ মাহমুদ: ক্রসফায়ার নিয়ে ছিলো?
রিফাত হাসান: হ্যাঁ। বরং ক্রসফায়ারটা অনেক বেশি মৌলিক আরকি। মানে, শিহাব শাহীন হচ্ছে একইসাথে আবার শাহবাগের ঘোরতর সমর্থক বলে আমি পড়েছি, খেয়াল করেছি। মানে, একইসাথে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যাপারে আপনার খুবই জোরদার অবস্থান প্রকাশ রাখতে পারবেন, জারি রাখতে পারবেন, একইসাথে আপনি পলিটিক্সের বিরুদ্ধেও আপনার অবস্থান ঝারি রাখতে পারবেন। এটা খুব সচেতন ঘটনা। হইতেই পারে আরকি। মানে, আশফাক নিপুণের এ ঘটনাটারে আপনি এটা দিয়েই শুধু ব্যাখ্যা করতে পারবেন না আরকি, মনে হয়।
সৌরভ মাহমুদ: আচ্ছা, ঠিকাছে, ভাই, আমার প্রশ্নের ওখানে আসি। আপনার শাহবাগ এবং হেফাজত এ বিষয়ে বিভিন্ন আলাপ আমরা ফেসবুকে পড়তেছি, বা আপনার লেখাতে বারবার আসছে, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি একটা জিনিসে আপনার প্রতি মুগ্ধ হইছি, সেটা হচ্ছে কী, আমি আপনার বইটা যখন পড়তেছিলাম, ‘সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি’, আপনার রাষ্ট্র, ধর্ম, আইন এগুলা নিয়ে একটা সুন্দর আলাপ বা চিন্তাধারা আছে। তো পড়তে পড়তে আমার কাছে মনে হইছে যে, আমি জানতে আগ্রহী, আপনি দেখা যাচ্ছে বারবার মানে আমরাও বলি রাষ্ট্রযন্ত্র নিপীড়কের মতো আছে। এখন হচ্ছে গিয়ে, রাষ্ট্র নিয়ে আপনার মূল ধারণাটা কী? ধরেন, আপনিও বলতেছেন যে, রাষ্ট্র নিপীড়ক, আবার দেখা যায়, মূল ধারার কমিউনিস্টরাও বলে যে রাষ্ট্র বলতে কিছু নাই, রাষ্ট্র নিপীড়ক যন্ত্র হিসেবে আছে। তো আমরা ধরে নিছি যে, রিফাত হাসান এবং কমিউনিস্টরা একইপথে, রাষ্ট্রহীন বিশ্ব। রাষ্ট্রহীন বিশ্বকে আমরা অ্যানার্কি বলেও জানি। তো এখন ধরেন, কমিউনিস্টরা কমিউনিজম বলবে। কিন্তু রাষ্ট্রহীন বিশ্ব বলতে আপনি কী বুঝাচ্ছেন? এটা কি অ্যানার্কির দিকে চলে যায় কিনা? মানে রাষ্ট্রকে আপনি কীভাবে দেখেন?
রিফাত হাসান: একটা জিনিস হচ্ছে, মানুষ যখন—আমি একটা ছোট জায়গা থেকে কথা আলাপগুলো শুরু করি—সেটা হচ্ছে, যেখান থেকে সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, রাজনীতি ধারণাটা নিয়ে আমি কথা বলি। তো, মানুষের তো জন্ম থেকে একটা একটা জার্নি থাকে। এ জার্নির ভেতরে মানুষের যখন পলিটক্যাল হয়ে ওঠাকে বুঝি, আমি এটাকে বলি যে, ধরেন, বন্ধুত্ব তৈরি হওয়া। মানুষের বন্ধুত্ব তৈরি হওয়ার স্তরে একটা ঘটনা আছে, সেটা হচ্ছে, মানুষের পরিপূর্ণভাবে সার্বভৌম হয়ে ওঠা, স্বাধীন হয়ে ওঠা। এ স্বাধীন হয়ে ওঠার পরে, মানুষের আসলে তখন বন্ধুত্ব তৈরি হয় এবং সে তখন যেটা করে, সেটা হচ্ছে, বন্ধুত্বটাকে চর্চা করতে শুরু করে। এটা হচ্ছে তাদের পলিটিক্যাল অর্গানাইজেশনের ধারণা, আমার কাছে। তো আমরা যেটার ব্যাপারে নরমালি, ধরেন, কমিনিস্টদের ব্যাপারে আপনি যেটা বলতেছেন, তাদের যেটা রাষ্ট্র নেই, মানে, রাষ্ট্র হচ্ছে বলপ্রয়োগের হাতিয়ার, তাদের কাছে। তো এ রাষ্ট্রের থেকে তারা আসলে যেটা করতে চায়, ধরেন, এটাকে পার হয়ে তারা অন্য রাষ্ট্রে যেতে চায়। ধরেন, প্রলেতারিয়েতের একনায়কতন্ত্র তৈরি হইল, এখানে পৌঁছাইতে চায়৷ যদিও এটাও তাদের আল্টিমেট গোল না। এটার পরে আরেকটা গোল আছে। যেখানে আল্টিমেট সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে। তো, ঘটনা সেটা না। আমি এটারে একটা, ধরেন, কল্পনা হিসেবে বলি। আমি বলি যে, এটা একটা কল্পনা। এটা কল্পনা, এ কারণে যে, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আপনি যখন দেখেন, আমাদের এখানে, ধরেন, শ্রেণিহীন সমাজ একটা কল্পনা। তাদের রাষ্ট্র নেই, সেটা একটা কল্পনা। এ কল্পনাকে আপনি তখনই ধরতে পারবেন, যখন দেখবেন, তাদের যখন একটা রাষ্ট্র তৈরি হয়ে গেলো, ধরেন, আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে একটা রাষ্ট্র তৈরি হয়ে গেলো তাদের, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটা, ধরেন, একটা জাসদের মন্ত্রিত্ব তৈরি হয়ে গেলো, তখন দেখবেন যে, তাদের কাছে, রাষ্ট্র মানে তখন সবকিছু। মানে, যখন শেখ মুজিবের রক্ষীবাহিনী হাতে, আপনার জাসদের নেতাকর্মীরা মরছে, তখন হচ্ছে যে আসলে, রাষ্ট্র নেই; কিন্তু যখন আপনি ক্ষমতায় এসে, মানে জামাত-শিবিরকে মারা শুরু করছেন, তখন দেখা যাচ্ছে, না, এই রাষ্ট্র হচ্ছে যে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা। এ দুটা রাষ্ট্রের যেটা তফাৎ, এ তফাতের জায়গাতে আমার আলাপটা হচ্ছে, আমার যেটা রাষ্ট্র, সে-রাষ্ট্র, এখন যেমন রাষ্ট্র নেই, মানে, জাসদের নেতাকর্মীদের যখন মারতেছে, তখন যেমন রাষ্ট্র নেই, একইভাবে, জামাত-শিবিরকে যখন মারতেছে, তখনও আসলে আমার রাষ্ট্র নেই। তার মানে আমার রাষ্ট্রটা কোন জায়গায় তাইলে? আমার রাষ্ট্র সম্পর্কিত আলাপটা হচ্ছে যে এখানে, মানে, শেষ পর্যন্ত এসে আপনি আসলে রাষ্ট্ররে ফর এভার ট্রুথ হিসেবে ধরে নিতে পারবেন না। মানব ইতিহাসে রাষ্ট্র হচ্ছে একটা ক্ষুদ্রতম ঘটনা। এটারে যদি আপনি ধরেন, একদম কনস্ট্যান্ট ট্রুথ হিসেবে ধরে নিয়ে, এটার কোনোভাবে বিলয় হবে না ধরে নেন, তাইলে এই ঘটনা ঘটে। মূলত মানুষের কাজই হচ্ছে যে রাষ্ট্রকে মানবিক করে তোলার চেষ্টা করা। এটার জন্য প্রয়োজনে রাষ্ট্রের বিলয় ঘটানো। মানে রাষ্ট্রটারেই আপনাকে রেখে দিতে হবে, সেটা ঘটনা না। দরকার হলে আপনি নতুন রাজনৈতিক সংগঠন করবেন। মানে, আমার কথা হচ্ছে, যেমন ধরেন, রাষ্ট্র সম্পর্কিত আমার ধারণাটা কেমন— রাষ্ট্রের আগের অবস্থায় মানুষ যেটুকু স্বাধীন ছিলো, যেরকম স্বাধীন ছিলো, আমি চাই, এমন একটা সময়, যে-সময়ে এসে মানুষ সেরকম স্বাধীন হয়ে থাকতে পারবে। এবং সমস্যা হচ্ছে, তখন আপনার যেটা হবে, মানে, রাষ্ট্র জিনিসটা তো আসলে একই সাথে একটা পাওয়ার এক্সারসাইজ করবে, মানে সার্বভৌমত্ব এক্সারসাইজ করবে, পাওয়ার এক্সারসাইজ করবে। এবং আমি যে-সময়ের কথা বলছি, যে-স্বাধীনতার কথা বলছি, সেখানে হচ্ছে যে, আপনিই হচ্ছেন যে সার্বভৌম হবেন। তো উভয় সার্বভৌমের একটা কিন্তু লড়াই চলবে। এবং লড়াইটা হচ্ছে সবসময়কার লড়াই, এটা এখনকার লড়াই না। সবসময়কার লড়াইটা থাকবে। আপনি যখন রাষ্ট্রের এই প্রব্লেম্যাটিক আলাপগুলো রিয়েলাইজ করতে থাকবেন, তখন আপনার রাষ্ট্র ধারণাও চেঞ্জ হতে থাকবে। আমার রাষ্ট্র সম্পর্কিত আলাপ এরকম কোনো চূড়ান্ত আলাপ না আর কি। আলাপগুলো হচ্ছে নিরন্তর ক্রিয়েটিভ থাকা। মানে, ফর্মগুলোর ব্যাপারে আমাদের আলাপটা হচ্ছে, ফর্মটা কোনোভাবে ফিক্সড ফর্ম না আরকি। মানে চিরায়ত কোনো ফর্ম না। পলিটিক্যাল, মানুষের পলিটিক্যাল ফর্মটা কোনো চিরায়ত ফর্ম না।
সৌরভ মাহমুদ: মানে আপনার রাষ্ট্রচিন্তা অ্যানার্কিজমের দিকেও যাইতে পারে।
রিফাত হাসান: অ্যানার্কিজম তো একটা ইজম।
সৌরভ মাহমুদ: আচ্ছা। তাইলে আমরা বলতে পারি, অরাজকতার দিকে মানে ধরেন কোনো রাষ্ট্র নাই।
রিফাত হাসান: হ্যাঁ, রাষ্ট্র নেই হতে পারে। রাষ্ট্র নেই মানে অ্যানার্কিজম ঘটনা, সেটা না। এটারে আপনি জাস্ট ডিফাইন করেন অ্যানার্কি হিসেবে। মানে আপনি দেখবেন যে, ধরেন, যারা মার্ক্সিস্ট, তাদেরও এক ধরণের অ্যানার্কিস্ট চিন্তা থাকে, চিন্তা আছে। আবার সব মার্ক্সিস্ট কিন্তু অ্যানার্কিস্ট না। মার্ক্সের চিন্তাটা হচ্ছে, প্রলেতারিয়েতের একনায়কতন্ত্র হওয়ার পরে, মানে আস্তে আস্তে ট্রানজিশনটা হবে। কিন্তু আবার অ্যানার্কিস্ট যারা আছে, তারা চিন্তা করে যে কোনোরকম ট্রানজিশনে ছাড়াই সরাসরি একটা বিপ্লব হবে।
• দ্বিতীয় ভাগ (শীগ্রই আসছে)
• তৃতীয় ভাগ (শীগ্রই আসছে)
— আড্ডার সম্পূর্ণ ভিডিওটি দেখুন:

Comments
Post a Comment